Homeসর্বশেষকোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পানিতে ডুবে দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু

কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় পানিতে ডুবে দুই ভাইয়ের মর্মান্তিক মৃত্যু

নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চর এলাহী ইউনিয়নের গাংচিল আবাসনে পুকুরের পানিতে ডুবে দুই ভাইয়ের করুণ মৃত্যু ঘটেছে। বুধবার (১৫ অক্টোবর) দুপুরে ঘটে যাওয়া এ ঘটনাটি স্থানীয়দের হৃদয় বিদীর্ণ করেছে। নিহত দুই শিশু হলেন—মো. মাসুম (৮) ও মো. মারুফ (৭), তারা গাংচিল আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরহারা পরিবার মো. মাসুদের সন্তান। পরিবারটি কয়েক মাস আগেও আশ্রয়ণ প্রকল্পে নিরাপদে বসবাস করছিল, কিন্তু হঠাৎ নদী ভাঙনের কবলে পড়ে তাদের ঘর নদীতে বিলীন হয়ে যায়। এরপর থেকে তারা বাধ্য হয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশের একটি ছাপড়া ঘরে মানবেতর জীবনযাপন করছিল।

বুধবার দুপুর সোয়া ২টার দিকে দুই ভাই বাড়ির পাশের মসজিদের পুকুরে গোসল করতে যায়। পরিবার তখন গৃহস্থালির কাজে ব্যস্ত ছিল। কিছু সময় পর শিশুদের দেখা না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। প্রতিবেশীদের সহায়তায় তারা পুকুরে তল্লাশি চালিয়ে দুই ভাইকে উদ্ধার করেন। পরে স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসকের কাছে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন। হঠাৎ এ মর্মান্তিক ঘটনায় মুহূর্তেই শোকের ছায়া নেমে আসে পুরো এলাকায়।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, নদীভাঙনের পর থেকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বহু পরিবার অনিরাপদ অবস্থায় বসবাস করছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারপাশে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা বা সুরক্ষা দেয়াল না থাকায় শিশুদের জন্য এটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। গাংচিলের অনেক পুকুর, খাল ও জলাশয়ে কোনোরূপ ঘের বা বাঁধ নেই। ফলে শিশুদের এমন দুর্ঘটনায় পড়ার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। এলাকাবাসী প্রশাসনের কাছে এসব জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তা বেড়াজাল, সাইনবোর্ড ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির দাবি জানিয়েছেন।

কোম্পানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গাজী মুহাম্মদ ফৌজুল আজিম বলেন, “দুর্ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। নিহত শিশুদের পরিবারের সঙ্গে কথা বলা হচ্ছে এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।” তিনি আরও জানান, প্রাথমিকভাবে এটি একটি দুর্ঘটনা বলেই মনে হচ্ছে, তবে পরিবার ও স্থানীয়দের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহ করে পুরো বিষয়টি তদন্ত করা হবে।

স্থানীয় শিক্ষক ও সমাজকর্মীরা জানিয়েছেন, নদীভাঙন ও ঘরহীনতার কারণে এসব পরিবার চরম মানসিক ও আর্থিক সংকটে রয়েছে। শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার মতো পরিবেশ তাদের নেই। অনেক সময় এসব শিশুরা অভিভাবকের অগোচরে আশপাশের পুকুরে বা নদীর পাড়ে খেলতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়। তারা মনে করেন, এই মৃত্যুগুলো কেবল পারিবারিক নয়, সামাজিক ব্যর্থতারও প্রতিচ্ছবি—যেখানে দারিদ্র্য, অবহেলা ও অনিরাপত্তা একসঙ্গে কাজ করছে।

এই ঘটনাটি নোয়াখালীর উপকূলীয় এলাকার আরেকটি বড় শিক্ষা হয়ে এসেছে। প্রতি বছর বর্ষা ও নদীভাঙনের মৌসুমে এমন দুর্ঘটনা ঘটে, তবুও প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ দেখা যায় না বললেই চলে। স্থানীয়দের দাবি, আশ্রয়ণ প্রকল্পগুলোতে শিশুদের জন্য নিরাপদ খেলার জায়গা, পুকুর বা জলাশয়ের পাশে সুরক্ষা বেড়া ও জনসচেতনতা কর্মসূচি চালু করা জরুরি।

দুই ভাইয়ের অকাল মৃত্যুর পর তাদের পরিবার এখন গভীর শোক ও বেদনায় ডুবে আছে। পিতা মো. মাসুদ ও মা কান্নায় ভেঙে পড়েছেন। প্রতিবেশীরা জানাচ্ছেন, পরিবারটি খুবই দরিদ্র—দৈনন্দিন জীবনের চাহিদা পূরণ করতেই হিমশিম খায় তারা। এখন সন্তান হারানোর এই আঘাত তাদের জীবনে আরও অন্ধকার নিয়ে এসেছে।

নোয়াখালীর গাংচিলের এই করুণ ঘটনা আবারও স্মরণ করিয়ে দেয়—বাংলাদেশের নদীভাঙনপ্রবণ ও জলাশয়ঘেরা এলাকায় শিশুদের জন্য সুরক্ষিত পরিবেশ গড়ে তোলার এখনই সময়। প্রশাসন, স্থানীয় সরকার ও সমাজের সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগেই হয়তো এমন হৃদয়বিদারক মৃত্যুগুলো রোধ করা সম্ভব হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

spot_img