Homeঅর্থনীতিশিল্পবাণিজ্য ধ্বংস হচ্ছে কার স্বার্থে

শিল্পবাণিজ্য ধ্বংস হচ্ছে কার স্বার্থে

ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে আমরা এখন সবকিছু নতুন করে শুরু করছি। রাষ্ট্র সংস্কার করছি। সবকিছুর লক্ষ্য, সবার অধিকার নিশ্চিত করে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা। এ কঠিন কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করতে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি এখন পর্যন্ত দেশবাসীর পূর্ণ আস্থা আছে। কারণ ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর এ সরকারের সফলতা অর্জন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প নেই। সরকার ইতোমধ্যে অনেক সমস্যার সমাধান দিতে সচেষ্ট হয়েছে। 

তবে এখন পর্যন্ত দুটি সমস্যা সরকারকে বিব্রত করছে। একটি হলো আইনশৃঙ্খলা এবং অন্যটি অর্থনৈতিক স্থবিরতা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য বিভিন্ন বাহিনী আছে। তারা কাজ করছে। অর্থনীতি গতিশীল করতে কার্যত তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি বেসরকারি বিনিয়োগকারী, শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাচ্ছেন না। গত সাত মাসে বেসরকারি পর্যায়ে নতুন কোনো বিনিয়োগ হয়নি। স্বভাবতই বেসরকারি পর্যায়ে কোনো কর্মসংস্থানও হয়নি। 

একের এর এক কলকারখানা বন্ধ হচ্ছে। অনেক প্রতিষ্ঠান রুগ্ণ হয়ে যাচ্ছে। নতুন কোনো শিল্প উদ্যোগ নেই। ব্যবসায়ীরা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থার কাছে তাদের সমস্যার কথা বলছেন। সরকারের কাছে সর্বাত্মক সহযোগিতার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু কেউ তাদের কথা শুনছেন না। সমস্যা সমাধানে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। 

অথচ অর্থ উপদেষ্টা নিজেই বলছেন, দেশের অর্থনীতি খাদের কিনারে। মুক্ত বাংলাদেশে এখন আমাদের শিল্প যদি ধ্বংস হয়, ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা যদি টিকে থাকতে না পারেন, তাহলে লাভবান হবে প্রতিবেশী ভারত। এ অবস্থায় প্রশ্ন হলো-কার স্বার্থে দেশের শিল্পবাণিজ্য ধ্বংস হচ্ছে? কার স্বার্থে ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের প্রতিপক্ষ বানানো হচ্ছে?

স্বাধীনতার পর থেকে অন্তর্বর্তী সরকার পর্যন্ত অর্থনীতি বোদ্ধা ব্যক্তি এ সরকারে বেশি। সরকারের শীর্ষ ব্যক্তি ড. মুহাম্মদ ইউনূস অর্থনীতির একজন পণ্ডিত এবং গোটা পৃথিবীতে সামাজিক ব্যবসা প্রবর্তন করে আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। 

অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ, পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর অর্থনীতির দিকপাল। তাদের অর্থনীতিতে জ্ঞান দেবে, এমন ধৃষ্টতা কেউ দেখাতে পারে বলে মনে করি না। তাদের বহু ছাত্র সারা পৃথিবীতে অর্থনীতির দিকনির্দেশনা দিচ্ছেন। তার পরও দেশের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিদের কেন দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে? 

কেন তারা যথাযথ সহায়তা, নিরাপত্তা, প্রণোদনা ইত্যাদি পাচ্ছেন না? ব্যবসায়ী শ্রেণিকে বাদ দিয়ে স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গঠন করা সম্ভব হবে না, এটা তো সবাই জানে। বিগত বছরগুলোতে বাংলাদেশে যে রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল, তাতে সরকার ও তার দোসরদের পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষভাবে জমাখরচ না দিয়ে কোনো ব্যবসায়ীর পক্ষে ব্যবসা করা সম্ভব হয়েছে কি না, তা একমাত্র ভুক্তভোগীরাই জানেন। 

নানা চাপে পড়ে ব্যবসায়ীদের অনেক কিছুই করতে হয়েছে, সেটা তো এখন যারা সরকারে আছেন, তারা সবাই অনুধাবন করছেন। তার পরও ব্যবসায়ীরা রীতিমতো কোণঠাসা অবস্থায় আছেন। বিগত সময়ে সরকারের পক্ষে রাখার জন্য ব্যবসায়ীদের ওপর নানাভাবে অনৈতিক চাপ তৈরি করা হয়েছিল। সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার চাপে প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ ও প্রতিশ্রুতি প্রদানে বাধ্য করা হতো। চাপে ফেলে আদায় করা হতো সমর্থন ও আনুগত্য। 

সেই সিন্ডিকেটের পালের গোদা সালমান এফ রহমান জেলখানায় থাকলেও ফ্যাসিস্ট সরকারের উল্লেখযোগ্য দোসর অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল (লোটাস কামাল), অর্থ ও ব্যাংকিং বিভাগের সচিবগণ, বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান, ফজলে কবির এবং আবদুর রউফ তালুকদার, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবু হেনা মো. রহমাতুল মুনিম, দুদক চেয়ারম্যান মঈনউদ্দীন আবদুল্লাহর মতো মহারথীরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়ে গেছেন। বিগত সরকারের সরাসরি পৃষ্ঠপোষকতায় যেসব ব্যবসায়ী বিদেশে অর্থ পাচার করেছেন, তাদের অনেকের মধ্যে একজন ছিলেন মন্ত্রী সাইফুজ্জামান। লন্ডনে তার ৩৬০টি বাড়ির খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া গেছে। 

সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় ব্যাংক লুট করেছেন এস আলম। যারা দেশ লুট করে বিদেশে পালিয়েছেন, তারা এখন মহানন্দে ও নিরাপদে আছেন। আর যারা দেশের মধ্যে শিল্পকারখানা তৈরি করেছেন, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন, অর্থনীতি গতিশীল রাখতে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন তাদের ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। অনেক শিল্পপতির শ্রমে-ঘামে গড়া শিল্পকারখানা এখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তারা নতুন কোনো বিনিয়োগের নিশ্চয়তা পাচ্ছেন না। ফলে আগ্রহও হারাচ্ছেন। শুধু রেমিট্যান্স ও গার্মেন্ট শিল্পের ওপর নির্ভর করে জাতীয় অর্থনীতিতে গতি ফিরবে না। সে কারণে সব ব্যবসায়ী-শিল্পপতিকে সঙ্গে নিয়ে পথচলা উচিত।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

spot_img