Homeমতামততিন ঘণ্টার বৃষ্টির পরও কেন দূষণে শীর্ষে ঢাকা?

তিন ঘণ্টার বৃষ্টির পরও কেন দূষণে শীর্ষে ঢাকা?

তিন ঘণ্টার ভারী বর্ষণেও কেন বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত নগরী ঢাকা?

রাজধানী ঢাকায় বুধবার সন্ধ্যা ছয়টা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত টানা তিন ঘণ্টায় ২৬ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে। সাধারণত এমন বৃষ্টির পর বাতাসের ধুলিকণা ধুয়ে গিয়ে বায়ুমানের উন্নতি হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ঘটেছে উল্টো ঘটনা। বৃহস্পতিবার সকালে বিশ্বের সবচেয়ে দূষিত শহরের তালিকায় উঠে এসেছে ঢাকা। আন্তর্জাতিক বায়ুমান পর্যবেক্ষণকারী প্রতিষ্ঠান IQAir–এর তথ্যমতে, সকাল ৯টায় ঢাকার এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স (AQI) ছিল ১৮৬, যা ‘অস্বাস্থ্যকর’ পর্যায়ে পড়ে। কিছু এলাকায় এই সূচক ২০০ ছাড়িয়ে গিয়ে ‘খুব অস্বাস্থ্যকর’ অবস্থায় পৌঁছেছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃষ্টি সাময়িকভাবে দূষণ কমালেও রাজধানীর অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ, উন্মুক্ত নির্মাণসামগ্রী, রাস্তাজুড়ে ধুলাবালি এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের কালো ধোঁয়া খুব দ্রুত আবার বাতাসকে দূষিত করে তুলছে। ফলে বৃষ্টির সুফল দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না।

বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়নকেন্দ্র (ক্যাপস)-এর চেয়ারম্যান আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর বেইলি রোড এলাকা থেকে তোলা কয়েকটি ছবি বিশ্লেষণ করে বলেন, ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় নির্মাণসামগ্রী উন্মুক্ত অবস্থায় পড়ে আছে। ইট, বালু ও সিমেন্টের ধুলা যানবাহনের চাকায় লেগে বড় সড়কে ছড়িয়ে পড়ছে। তাঁর মতে, রাজধানীতে অন্তত ৩০০টির বেশি স্থানে একই ধরনের পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

তিনি বলেন,
“বৃষ্টি হলে কিছু সময়ের জন্য ধুলা নিচে নেমে যায়। কিন্তু যেহেতু নির্মাণকাজের স্থানে কোনো ধরনের সুরক্ষা নেই, তাই অল্প সময়ের মধ্যেই ধুলাবালি আবার বাতাসে মিশে যাচ্ছে। এর সঙ্গে রয়েছে কালো ধোঁয়া ছড়ানো ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, যেগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেই।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার বায়ুদূষণের প্রধান উৎসগুলোর মধ্যে রয়েছে—

  • অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণকাজ
  • রাস্তার ধুলাবালি
  • পুরোনো ও ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন
  • ইটভাটা ও শিল্পকারখানার ধোঁয়া
  • খোলা জায়গায় বর্জ্য পোড়ানো

পরিবেশবিদরা বলছেন, রাজধানীতে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলোতে ধুলা নিয়ন্ত্রণের নিয়ম মানা হচ্ছে না। নির্মাণস্থল ঘিরে না রাখা, পানি ছিটানো না হওয়া এবং নির্মাণসামগ্রী ঢেকে না রাখার কারণে বাতাসে বিপুল পরিমাণ ক্ষুদ্র ধুলিকণা ছড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে PM2.5 নামের অতিক্ষুদ্র কণা মানুষের ফুসফুসে প্রবেশ করে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।

বৃহস্পতিবারের বায়ুদূষণের তালিকায় ঢাকার পর দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল লাহোর। শহরটির AQI ছিল ১৫৩। তৃতীয় অবস্থানে থাকা জাকার্তা–র স্কোর ছিল ১২৭। তালিকায় আরও ছিল দুবাই, কলকাতা, দিল্লি ও কাবুল।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, দীর্ঘসময় দূষিত বাতাসে অবস্থান করলে শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা, হৃদরোগ, ফুসফুসের ক্যানসার এবং স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে। শিশু, বয়স্ক ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।

আজ ঢাকার সবচেয়ে দূষিত এলাকার মধ্যে শীর্ষে ছিল আগারগাঁও–এর বিআইডিএস এলাকা, যেখানে AQI ছিল ২১৩। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বেচারাম দেউড়ী, যার স্কোর ২০৭। এছাড়া ধানমন্ডি, উত্তর বাড্ডা, বারিধারা ও গুলশান এলাকার বাতাসও ছিল অস্বাস্থ্যকর পর্যায়ে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধু প্রকল্প গ্রহণ নয়, বিদ্যমান আইন কার্যকর করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সিটি করপোরেশন ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি নির্মাণস্থলে ধুলা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত পানি ছিটানো এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহনের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করে, তাহলে ঢাকার বায়ুমানে দ্রুত ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব।

বর্ষাকাল শুরু হলেও রাজধানীবাসীর জন্য স্বস্তির বৃষ্টি এখন আর স্বস্তি বয়ে আনছে না। বরং প্রতিদিনের দূষণ, ধুলা আর বিষাক্ত বাতাসে ঢাকা ক্রমেই পরিণত হচ্ছে এক দমবন্ধ নগরীতে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

spot_img