রাঙামাটির কাউখালী–রানীরহাট সড়কের গুরুত্বপূর্ণ বেইলি সেতুটি মেরামতের মাত্র দুই দিনের মাথায় আবারও অচল হয়ে পড়েছে। অতিরিক্ত ইটবোঝাই একটি ট্রাক সেতু পার হওয়ার সময় পাটাতন ভেঙে যাওয়ায় ট্রাকটি সেতুর মাঝখানেই আটকে যায়। বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় কাউখালী উপজেলার সঙ্গে রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, রোগী এবং ব্যবসায়ীরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দুর্ঘটনার সময় ইটবোঝাই ট্রাকটি পাশের চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার বিভিন্ন ইটভাটা থেকে কাউখালীর দিকে আসছিল। সেতুর মাঝামাঝি পৌঁছানোর পর অতিরিক্ত ওজনের চাপ সহ্য করতে না পেরে হঠাৎ করেই পাটাতনের একটি অংশ ভেঙে পড়ে। এতে ট্রাকটি সেতুর ওপর আটকে যায় এবং উভয় দিক থেকে যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি বিকল্প সড়ক না থাকায় শত শত যাত্রীকে চরম ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই সেতুতে এটি দ্বিতীয়বারের মতো পাটাতন ভেঙে পড়ার ঘটনা। এর আগে গত শনিবার একইভাবে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হলে কয়েকদিন যান চলাচল বন্ধ ছিল। পরে সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের জরুরি মেরামত শেষে মঙ্গলবার থেকে যান চলাচল পুনরায় চালু করা হয়। তবে সেই স্বস্তি স্থায়ী হয়নি। মাত্র দুই দিন পরই আবারও একই ধরনের দুর্ঘটনায় সেতুটির দুর্বলতা এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নতুন করে সামনে এসেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে পাশের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সেগুনবাগান, বহড়াতল, বেতছড়ি ও ত্রিপুরা দিঘি এলাকার বিভিন্ন ইটভাটা থেকে প্রতিদিন অসংখ্য অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক এই সড়ক ব্যবহার করছে। এসব ট্রাকের অধিকাংশই নির্ধারিত ওজনসীমা অতিক্রম করে চলাচল করলেও কার্যকরভাবে তা নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না। ফলে পুরোনো বেইলি সেতুর ওপর প্রতিনিয়ত অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে এবং বারবার দুর্ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সেতুর দুই পাশে পাঁচ টনের বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল নিষিদ্ধ উল্লেখ করে সাইনবোর্ড থাকলেও বাস্তবে তা মানার কোনো প্রবণতা দেখা যায় না। প্রশাসনের নজরদারি ও আইন প্রয়োগের ঘাটতির সুযোগ নিয়ে ভারী ট্রাকগুলো নিয়মিত চলাচল করছে। তাদের দাবি, নিয়মিত ওজন নিয়ন্ত্রণ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়া পর্যন্ত একই ধরনের ঘটনা বারবার ঘটতেই থাকবে।
এদিকে সেতু অচল হয়ে পড়ায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছেন স্থানীয় কৃষক, ব্যবসায়ী ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনকারীরা। কাউখালী উপজেলার সঙ্গে রাঙামাটি ও চট্টগ্রামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই সড়ক বন্ধ থাকায় পণ্য পরিবহনে বিলম্ব হচ্ছে, বাড়ছে পরিবহন ব্যয়। পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে যাওয়া রোগী, শিক্ষার্থী এবং চাকরিজীবীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। অনেক যাত্রীকে দীর্ঘ পথ ঘুরে বিকল্প সড়ক ব্যবহার করতে হচ্ছে, যার ফলে সময় ও অর্থ—উভয়ই বেশি ব্যয় হচ্ছে।

রাঙামাটি সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সবুজ চাকমা জানিয়েছেন, সেতুটি অনেক পুরোনো হওয়ায় এর ওপর পাঁচ টনের বেশি ওজনের যানবাহন চলাচল দীর্ঘদিন ধরেই নিষিদ্ধ। চালকদের সতর্ক করতে সেতুর উভয় পাশে সাইনবোর্ডও স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু নির্দেশনা উপেক্ষা করে অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক চলাচল অব্যাহত থাকায় একই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে।
তিনি আরও বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত পাটাতন দ্রুত মেরামতের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং যত দ্রুত সম্ভব সেতুতে যান চলাচল স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে শুধু মেরামত করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। সেতুর ওপর অতিরিক্ত ওজনের যানবাহন চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ভবিষ্যতেও একই ধরনের দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, কেবল অস্থায়ী মেরামতের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কে নিরাপদ ও দীর্ঘমেয়াদি যোগাযোগ নিশ্চিত করতে পুরোনো বেইলি সেতুর পরিবর্তে আধুনিক ও স্থায়ী সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ওজন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কার্যকর করা, নিয়মিত তদারকি বাড়ানো এবং অতিরিক্ত মালবোঝাই যানবাহনের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন তারা।
বারবার একই সেতুর পাটাতন ভেঙে পড়ার ঘটনা শুধু একটি অবকাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত নয়; এটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতিকেও সামনে নিয়ে এসেছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, দ্রুত সেতু মেরামতের পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে, যাতে ভবিষ্যতে একই কারণে কাউখালী অঞ্চলের মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড আর ব্যাহত না হয়।



