টানা কয়েক দিন ধরে তীব্র মাথাব্যথা, চোখের চারপাশে চাপ আর ঘাড়ে টান—এমন উপসর্গ নিয়ে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় চিকিৎসকদের চেম্বারে ভিড় করছেন নানা বয়সী মানুষ। অনেকেই বলছেন, স্বাভাবিক ঘুম ও রক্তচাপ ঠিক থাকলেও ব্যথা কমছে না, কাজকর্মে ব্যাঘাত ঘটছে।
নাক-কান-গলা বিশেষজ্ঞ ডা. জোনায়েদ রহিম জানান, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মাথা, ঘাড় ও চোখ ব্যথার সমস্যা নিয়ে রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। তাঁর ভাষায়, “বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এটি ভাইরাসজনিত সংক্রমণের উপসর্গ। তবে এবারের একটি লক্ষণ হলো—অনেক রোগীর ক্ষেত্রে জ্বরের মাত্রা তুলনামূলক বেশি, যা কোভিডের শুরুর দিকের সঙ্গে মিল আছে।”

তিনি বলেন, রোগীর উপসর্গ অনুযায়ী জ্বর হলে প্যারাসিটামল, অ্যালার্জি থাকলে অ্যান্টিহিস্টামিন এবং জ্বর চার-পাঁচ দিনের বেশি স্থায়ী হলে প্রয়োজনে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হচ্ছে। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ না খাওয়ার ওপর জোর দেন তিনি।
জাতীয় রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)-এর সংযুক্ত চিকিৎসক ডা. মোনালিসা জানান, মাথা, চোখ ও ঘাড় ব্যথা ভাইরাল জ্বরের পরিচিত উপসর্গ। “এটি নতুন কোনো বিষয় নয়। ভাইরাস সংক্রমণে একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম উপসর্গ দেখা দিতে পারে,” বলেন তিনি।
এই সময়ে বাতাসে রেসপিরেটরি সিনসিশিয়াল ভাইরাস (আরএসভি)-এর প্রকোপ বাড়ে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। এই ভাইরাস শ্বাসতন্ত্রে আঘাত করে এবং এর উপসর্গ হিসেবে জ্বর, মাথাব্যথা, ঘাড় ব্যথা, চোখের পেছনে ব্যথা, গলা ব্যথা ও নাক দিয়ে পানি পড়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। ইনফ্লুয়েঞ্জা, রাইনোভাইরাস ও অ্যাডিনোভাইরাসকেও এই সময় সক্রিয় থাকতে দেখা যায়।
ডা. মোনালিসা বলেন, “ভাইরাসে কোনো পরিবর্তন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করতে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন। কেবল উপসর্গ দেখে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা সম্ভব নয়।”
আবহাওয়ার প্রভাব ও ‘সাইনাস হেডেক’
বিশেষজ্ঞদের মতে, শীত ও বসন্তের সন্ধিক্ষণে দিনের তাপমাত্রা ও আর্দ্রতার তারতম্য শরীরের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করে। বৃষ্টি না হওয়ায় বাতাসে ধুলোবালি ও পরাগরেণুর মাত্রা বেড়ে অ্যালার্জিক রাইনাইটিস ও সাইনাসের সমস্যা বাড়ে।

Your Complete Digital Marketing Solution for Social Media & Google Advertising. dpbsonline.com https://www.facebook.com/dpbsonline
ঠান্ডা ও গরমের হঠাৎ পরিবর্তনে মাথার ভেতরের রক্তনালিগুলো বারবার সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়, যা মাথাব্যথার কারণ হতে পারে। নাক বন্ধ হয়ে গেলে সাইনাসের নালিতে চাপ তৈরি হয়ে কপাল ও চোখের চারপাশে ব্যথা দেখা দেয়, যাকে ‘সাইনাস হেডেক’ বলা হয়।
জীবনযাপনের ভূমিকা
শুষ্ক আবহাওয়ায় শরীর দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়ে। তাছাড়া শীতকালে তৃষ্ণা কম লাগায় অনেকেই পর্যাপ্ত পানি পান করেন না। চিকিৎসকদের মতে, ডিহাইড্রেশন মাথাব্যথার একটি বড় কারণ।
এ ছাড়া দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহারের ফলে ঘাড়ের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। ‘টেক্সট নেক’ নামের এই সমস্যা শীতকালে আরও প্রকট হয়। ঘুমের অনিয়ম থাকলে মাইগ্রেন ও ঘাড় ব্যথার ঝুঁকিও বাড়ে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু, ৫৫ বছরের বেশি বয়সী মানুষ এবং যাদের হাঁপানি বা শ্বাসকষ্টের সমস্যা রয়েছে, তারা তুলনামূলক বেশি ঝুঁকিতে থাকেন।
সতর্কতার পরামর্শ
চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে বড় ধরনের চিকিৎসার প্রয়োজন নাও হতে পারে। তবে কিছু অভ্যাস মেনে চললে উপসর্গ কমানো সম্ভব। এর মধ্যে রয়েছে—
- ঠান্ডা আবহাওয়ায় মাথা, কান ও কপাল ঢেকে বাইরে বের হওয়া
- পর্যাপ্ত পানি ও গরম তরল পান করা
- ঘাড়ে গরম সেঁক ও কপালে হালকা ঠান্ডা কাপড় ব্যবহার
- দীর্ঘ সময় এক ভঙ্গিতে কাজ না করা
- নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ও সঠিক ঘুম
- ধুলোবালি এড়াতে মাস্ক ব্যবহার ও হাত পরিষ্কার রাখা
ডা. মোনালিসার ভাষায়, ঋতু পরিবর্তনের এই সময়টায় শরীর একটু বেশি যত্ন চায়। ছোট উপসর্গকে অবহেলা না করে, আবার অকারণ আতঙ্কে না ভুগে সচেতন থাকাই সবচেয়ে ভালো পথ।



