Homeআন্তর্জাতিকনেইমারের বিদায়ে শেষ হলো এক সোনালি যুগ

নেইমারের বিদায়ে শেষ হলো এক সোনালি যুগ

ব্রাজিল জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসে একটি আবেগঘন অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। প্রায় দেড় দশক ধরে সেলেসাওদের আক্রমণভাগের নেতৃত্ব দেওয়া সুপারস্টার নেইমার ডি সিলভা জুনিয়র আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে আনুষ্ঠানিক অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন। বিশ্বের কোটি কোটি ফুটবলপ্রেমীর কাছে এটি শুধু একজন খেলোয়াড়ের বিদায় নয়, বরং ব্রাজিল ফুটবলের একটি যুগের অবসান। কোপা সুদামেরিকানায় ভেনেজুয়েলার ইউনিভার্সিদাদ সেন্ট্রালের বিপক্ষে সান্তোসের জয় শেষে ভিলা বেলমিরো স্টেডিয়ামের মিক্সড জোনে সাংবাদিকদের সামনে আবেগঘন কণ্ঠে নিজের সিদ্ধান্ত জানান ব্রাজিলের সর্বকালের অন্যতম সেরা এই ফুটবলার।

জাতীয় দলের জার্সি গায়ে নেইমারের শেষ বক্তব্য ছিল আবেগে ভরা। তিনি বলেন, “জাতীয় দলের সঙ্গে আমার সময় শেষ। দেশের জন্য আমি সবকিছু দিয়েছি—রক্ত, ঘাম, পরিশ্রম, জীবন। প্রতিটি ম্যাচে আমি সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, বিদায় বলার এটাই সঠিক সময়।” তার এই বক্তব্য মুহূর্তেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং ফুটবল অঙ্গনে শুরু হয় আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার ঢেউ।

নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ ছিল ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে নরওয়ের বিপক্ষে। পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল সেই ম্যাচে ২-১ গোলের পরাজয়ে বিদায় নেয়। নরওয়ের হয়ে জোড়া গোল করেন তারকা স্ট্রাইকার আর্লিং হালান্ড। অন্যদিকে যোগ করা সময়ে পেনাল্টি থেকে ব্রাজিলের একমাত্র গোলটি করেন নেইমার। শেষ বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। তখনই অবসরের ইঙ্গিত দিলেও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেন কয়েকদিন পর।

সংখ্যার বিচারে নেইমারের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম সফল। জাতীয় দলের হয়ে তিনি ১৩০টি ম্যাচে ৮০টি গোল এবং ৫৮টি অ্যাসিস্ট করেছেন। তার গোলসংখ্যা ব্রাজিলের ফুটবল ইতিহাসে সর্বোচ্চদের মধ্যে অন্যতম। তবে শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে নেইমারের প্রভাবকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব নয়। তার অসাধারণ ড্রিবলিং, চোখধাঁধানো স্কিল, গতি, সৃজনশীলতা এবং গোল তৈরির ক্ষমতা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে ব্রাজিলের আক্রমণভাগকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিল। প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগের জন্য তিনি ছিলেন সবসময়ই সবচেয়ে বড় আতঙ্ক।

জাতীয় দলের হয়ে নেইমারের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ নিঃসন্দেহে বিশ্বকাপ ট্রফি জিততে না পারা। ২০১৪ সালে নিজের দেশে অনুষ্ঠিত বিশ্বকাপে ইনজুরির কারণে সেমিফাইনালের আগে ছিটকে পড়েন তিনি। সেই বিশ্বকাপেই জার্মানির বিপক্ষে ঐতিহাসিক ৭-১ গোলের পরাজয় দেখে অসহায়ের মতো থাকতে হয়েছিল তাকে। এরপর ২০১৮ সালে বেলজিয়ামের কাছে কোয়ার্টার ফাইনালে এবং ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়ার কাছে টাইব্রেকারে হেরে বিদায় নেয় ব্রাজিল। সর্বশেষ ২০২৬ বিশ্বকাপেও নরওয়ের কাছে হেরে তার বিশ্বকাপ স্বপ্নের সমাপ্তি ঘটে। চারটি বিশ্বকাপ খেলেও ব্রাজিলকে কাঙ্ক্ষিত ষষ্ঠ শিরোপা এনে দিতে না পারা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় অপূর্ণতা হয়েই রয়ে গেল।

তবে জাতীয় দলের হয়ে নেইমারের অর্জন কোনোভাবেই ছোট নয়। ২০১৩ সালের ফিফা কনফেডারেশন্স কাপে অসাধারণ পারফরম্যান্স করে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। টুর্নামেন্টজুড়ে তার নৈপুণ্য তাকে বিশ্বের অন্যতম সেরা ফুটবলারের কাতারে নিয়ে যায়। এছাড়া ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে অনূর্ধ্ব-২৩ দলকে নেতৃত্ব দিয়ে ব্রাজিলকে ইতিহাসের প্রথম অলিম্পিক ফুটবল স্বর্ণপদক এনে দেন। ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে নির্ধারক টাইব্রেকারে জয়সূচক শটটি নিয়েছিলেন নেইমার নিজেই, যা ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ইতিহাসে অন্যতম স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে আছে।

বিশ্বকাপেও নেইমারের ব্যক্তিগত পরিসংখ্যান ঈর্ষণীয়। তিনি চারটি বিশ্বকাপে মোট ১৪ ম্যাচে ৯ গোল করেন। ব্রাজিলের বিশ্বকাপ ইতিহাসে অন্যতম সফল গোলদাতাদের তালিকায় নিজের নাম লেখান। একই সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপ ম্যাচ খেলা ব্রাজিলিয়ানদের অন্যতম হিসেবেও জায়গা করে নেন তিনি। বড় মঞ্চে তার অসংখ্য স্মরণীয় গোল ও পারফরম্যান্স এখনও ফুটবলপ্রেমীদের মনে গেঁথে আছে।

নরওয়ের বিপক্ষে শেষ ম্যাচে অবশ্য একটি বিতর্কও তৈরি হয়। পেনাল্টি থেকে গোল করার পর নরওয়ের গোলরক্ষক অরইয়ান নিল্যান্ডের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়েন নেইমার। তবে সেই বিতর্ক খুব দ্রুতই চাপা পড়ে যায় তার বিদায়ের আবেগে। ম্যাচ শেষে চোখের জল, সতীর্থদের আলিঙ্গন এবং দর্শকদের করতালির মধ্য দিয়েই শেষ হয় ব্রাজিলের জার্সিতে তার দীর্ঘ ও গৌরবময় পথচলা।

মাত্র ১৮ বছর বয়সে ব্রাজিলের জাতীয় দলে অভিষেকের পর থেকেই নেইমারকে দেশটির ফুটবলের ভবিষ্যৎ হিসেবে দেখা হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি সেই প্রত্যাশার বড় একটি অংশ পূরণও করেন। পেলের পর ব্রাজিলের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফুটবল তারকা হিসেবে বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি সমর্থকের হৃদয়ে জায়গা করে নেন। মাঠের জাদুকরী ফুটবল, অসাধারণ গোল, চোখধাঁধানো ড্রিবল এবং ম্যাচ জেতানোর ক্ষমতা তাকে আধুনিক ফুটবলের অন্যতম সেরা আইকনে পরিণত করে।

নেইমারের বিদায়ের মাধ্যমে ব্রাজিল ফুটবল একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে দলটির আক্রমণের কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন তিনি। এখন নতুন প্রজন্মের তারকাদের কাঁধেই উঠবে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ভবিষ্যতের দায়িত্ব। নেইমারের শূন্যতা পূরণ করা সহজ হবে না, কারণ তিনি শুধু একজন ফুটবলার নন—তিনি ছিলেন একটি প্রজন্মের আবেগ, ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের প্রতীক এবং বিশ্বের কোটি সমর্থকের ভালোবাসার নাম।

বিশ্বকাপ ট্রফি হয়তো তার হাতে ওঠেনি, কিন্তু ব্রাজিল ফুটবলের ইতিহাসে নেইমারের অবদান চিরকাল শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে। সময়ের সঙ্গে নতুন তারকারা আসবেন, নতুন ইতিহাসও লেখা হবে। তবুও ব্রাজিলের হলুদ জার্সিতে ‘নাম্বার টেন’ পরে নেইমারের সেই হাসি, সেই ড্রিবল, সেই গোল এবং সমর্থকদের উচ্ছ্বাস ফুটবল ইতিহাসের পাতায় অমর হয়ে থাকবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

spot_img