সুদানের উত্তর করদোফান প্রদেশে আধাসামরিক বাহিনী র্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেস (আরএসএফ) পরিচালিত এক ভয়াবহ ড্রোন হামলায় অন্তত ৪০ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। নিহতদের মধ্যে নারী, শিশু ও বয়োবৃদ্ধরা রয়েছেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলিতে ওই অঞ্চলে সংঘটিত অন্যতম ভয়াবহ বেসামরিক হত্যাযজ্ঞ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। তুরস্কভিত্তিক সংবাদমাধ্যম টিআরটি ওয়ার্ল্ড মঙ্গলবার (৪ নভেম্বর) এক প্রতিবেদনে জানায়, প্রাদেশিক রাজধানী আল-ওবেইদ শহরের পূর্বাঞ্চলীয় আল-লুয়াইব গ্রামে এই হামলার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় এক কর্মকর্তা আল জাজিরাকে জানান, ড্রোন হামলাটি সোমবার স্থানীয় সময় দুপুরে চালানো হয় এবং এটি সরাসরি একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ায় অংশ নেওয়া বেসামরিক জনগণের ওপর লক্ষ্য করা হয়। প্রাদেশিক সরকার জানায়, অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য ব্যবহৃত একটি বড় তাঁবুতে শতাধিক মানুষ জড়ো ছিলেন, আরএসএফের ড্রোন সেখানে বোমা নিক্ষেপ করে। মুহূর্তের মধ্যেই তাঁবুটি আগুনে পুড়ে যায় এবং চারদিকে লাশের স্তূপ পড়ে থাকে। আহতদের মধ্যে অনেকেই আশঙ্কাজনক অবস্থায় হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন, ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সরকার এই হামলাকে বেসামরিক নাগরিকদের ওপর আরএসএফের ধারাবাহিক নৃশংসতা ও যুদ্ধাপরাধের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এক সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়, “নারী, শিশু ও বৃদ্ধদের নির্বিচারে হত্যা করার মাধ্যমে আরএসএফ আবারও প্রমাণ করেছে, তারা কেবল সামরিক বাহিনীর প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, বরং জনগণের শত্রু।” বিবৃতিতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, আরএসএফকে অবিলম্বে “সন্ত্রাসী সংগঠন” হিসেবে ঘোষণা করে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হোক। সুদানি সরকার আরও অভিযোগ করেছে যে, আরএসএফ নিয়মিতভাবেই নিরস্ত্র জনগণের ওপর হামলা চালিয়ে ভয় ও বিশৃঙ্খলার পরিবেশ তৈরি করছে, যাতে তারা অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ আরও দৃঢ় করতে পারে।
এই ঘটনার পেছনে আরএসএফের পূর্বঘোষণারও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। গত সপ্তাহেই তারা ঘোষণা করেছিল, আল-ওবেইদ শহরে বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালানো হবে এবং স্থানীয়দের নিরাপদ করিডোর ব্যবহার করে শহর ত্যাগ করতে বলা হয়। কিন্তু সরকার ও মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগ, ওই ঘোষণার আড়ালে তারা পরিকল্পিতভাবে বেসামরিক জনগণকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে। হামলার পর আল-লুয়াইব গ্রামে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, অনেকে বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যায়। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, আরএসএফের ড্রোন হামলায় পুরো একটি পাড়া ধ্বংস হয়ে গেছে, বহু ঘরবাড়ি মাটির সঙ্গে মিশে গেছে।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানায়, অক্টোবরের শেষ দিক থেকে উত্তর ও দক্ষিণ করদোফান অঞ্চলজুড়ে নিরাপত্তাহীনতা চরমে পৌঁছেছে। গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত ৩৮ হাজার মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন এবং তারা পার্শ্ববর্তী প্রদেশে আশ্রয় নিচ্ছেন। আইওএমের প্রতিবেদন অনুসারে, বাস্তুচ্যুতদের বেশিরভাগই নারী, শিশু ও প্রবীণ নাগরিক, যাদের কাছে পর্যাপ্ত খাবার, পানি বা চিকিৎসাসেবার সুযোগ নেই। জাতিসংঘের মানবাধিকার সংস্থাগুলোও পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং বেসামরিক নাগরিকদের ওপর হামলার ঘটনায় তাৎক্ষণিক আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছে।

আপনার সৃজনশীলতাই হতে পারে আয়ের উৎস — ভিডিও এডিটিং শিখে বদলে দিন ভবিষ্যৎ!
Web: thecloudemy.com
এদিকে, চলমান সংঘাতে আরএসএফ সম্প্রতি উত্তর করদোফানের বারা শহর দখল করে নিয়েছে, যদিও তারা বেসামরিকদের লক্ষ্য করে হামলা চালানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছে। আরএসএফ দাবি করেছে, তারা কেবল সরকারি সেনাদের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানাচ্ছে। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য এবং হাসপাতাল সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। অসংখ্য সাধারণ মানুষ ড্রোন হামলা ও গোলাবর্ষণের শিকার হয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন বা গুরুতর আহত হচ্ছেন।
এর আগে, গত ২৬ অক্টোবর আরএসএফ উত্তর দারফুর প্রদেশের রাজধানী আল-ফাশের শহর দখল করে নেয়। সেই সময়ও ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়, যেখানে শত শত বেসামরিক নাগরিক নিহত হন এবং বহু পরিবার নিখোঁজ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো ওই হামলাকে “জাতিগত নিধনের পূর্বাভাস” বলে অভিহিত করেছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, চলমান সংঘাত যদি দ্রুত নিয়ন্ত্রণে না আসে, তবে সুদানের ভৌগোলিক বিভাজন আরও পোক্ত হয়ে দেশটি স্থায়ীভাবে ভেঙে পড়তে পারে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালের ১৫ এপ্রিল থেকে সুদান ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে রয়েছে। সরকারি সেনাবাহিনী ও আরএসএফের মধ্যে ক্ষমতা দখলের লড়াই শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন, লক্ষাধিক মানুষ আহত বা বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। রাজধানী খার্তুমসহ দেশের একাধিক প্রদেশে অব্যাহত যুদ্ধের কারণে মানবিক সংকট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক কূটনৈতিক উদ্যোগে শান্তিচুক্তির চেষ্টা চললেও তা বারবার ব্যর্থ হয়েছে। পর্যবেক্ষকদের মতে, যতদিন পর্যন্ত বেসামরিক জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত না করা যায় এবং উভয় পক্ষ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মেনে না চলে, ততদিন সুদানে স্থায়ী শান্তির কোনো সম্ভাবনা নেই।
তবে বর্তমান হামলাটি সুদানের চলমান সংকটে এক নতুন ভয়াবহ অধ্যায় যোগ করেছে। আল-লুয়াইব গ্রামে নিহতদের স্মরণে স্থানীয় জনগণ শোক পালন করছেন, কিন্তু একই সঙ্গে তাঁরা আশঙ্কায় রয়েছেন—যে কোনো মুহূর্তে আরও হামলা হতে পারে। বিশ্লেষকেরা বলছেন, এই হামলা শুধু একটি স্থানীয় ট্র্যাজেডি নয়, বরং এটি সুদানের গৃহযুদ্ধের নিষ্ঠুর বাস্তবতাকে বিশ্ববাসীর সামনে আবারও উন্মোচন করেছে—একটি দেশ যেখানে নিরস্ত্র মানুষ এখন আর নিরাপদ নয়, এমনকি শোক পালন করাও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।



