নোয়াখালীসহ সারাদেশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতিতে যাওয়ার পর প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় এক গভীর অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলায় সহকারী শিক্ষকরা পাঠদান বন্ধ রেখে দাবি আদায়ের আন্দোলনে নেমেছেন। এর ফলে নোয়াখালী জেলার প্রায় ১২ শ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সম্পূর্ণভাবে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীরা প্রতিদিনের মতো স্কুলে গেলেও শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করছেন না, বরং তারা বিদ্যালয়ের মাঠে বা প্রাঙ্গণে অবস্থান কর্মসূচি পালন করছেন। এ অবস্থায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা ও বিভ্রান্তি দেখা দিয়েছে, আর অভিভাবকেরা সন্তানদের শিক্ষা ব্যাহত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। অনেক বিদ্যালয়ে দেখা গেছে, সকাল থেকে শিশুরা বই খাতা নিয়ে উপস্থিত হলেও ঘণ্টা বাজানোর পর শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে না যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে যাচ্ছে।

শিক্ষকরা জানিয়েছেন, তাদের এই কর্মবিরতি হঠাৎ করে নয়, বরং দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অবহেলার ফল। তারা তিন দফা দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন—প্রথমত, সহকারী শিক্ষক পদকে ১১তম গ্রেডে উন্নীত করতে হবে; দ্বিতীয়ত, ১০ ও ১৬ বছরের চাকরিতে উচ্চতর গ্রেড প্রাপ্তির জটিলতা দূর করতে হবে; এবং তৃতীয়ত, প্রধান শিক্ষক পদে শতভাগ পদোন্নতির নিশ্চয়তা দিতে হবে। শিক্ষকরা অভিযোগ করছেন যে, সরকারি কাঠামোয় তারা সবসময়ই বৈষম্যের শিকার। একই যোগ্যতা ও দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও অন্যান্য সরকারি কর্মচারীদের তুলনায় তারা কম বেতন ও সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন। তাদের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষা হলো দেশের ভিত্তি, অথচ সেই ভিত্তি গড়ে তোলার দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের প্রতি সরকারের মনোযোগ কম। তারা আরও অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের দাবিগুলো শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরকে জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সম্প্রতি ঢাকার শাহবাগে সহকারী শিক্ষকদের একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে পুলিশের লাঠিচার্জ, ধাওয়া ও গ্রেপ্তারের ঘটনায় শিক্ষক সমাজের মধ্যে প্রবল ক্ষোভ সৃষ্টি হয়। এর প্রতিবাদে নোয়াখালীসহ সারাদেশের শিক্ষকরা একযোগে কর্মবিরতির ঘোষণা দেন। আন্দোলনের ফলে শুধু নোয়াখালী নয়, দেশের প্রায় ৬৫ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান ব্যাহত হয়েছে। এতে প্রায় এক কোটি শিক্ষার্থী শিক্ষাবঞ্চিত হচ্ছে, যা দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য এক বড় ধাক্কা। নোয়াখালী জেলায় প্রাথমিক শিক্ষার মান আগেও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে ছিল—এখন কর্মবিরতির কারণে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগত ক্ষতি আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় শিক্ষাবিদরা।

আপনার ব্যবসার বিক্রি বাড়াতে চান? এখনই সময় DPBS-এর সাথে এগিয়ে যাওয়ার! https://www.facebook.com/DPBS20
জেলার শিক্ষা কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা আন্দোলনরত শিক্ষকদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন এবং আলোচনার মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। তবে শিক্ষক সংগঠনগুলোর নেতারা স্পষ্ট করে বলেছেন, তাদের দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করা হবে না। তারা বলেন, “আমরা শিক্ষাদান বন্ধ রাখতে চাই না, কিন্তু আমাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে রাজি নই।” অন্যদিকে, অভিভাবক সমাজ বলছে, সরকার ও শিক্ষক উভয় পক্ষকেই আলোচনার মাধ্যমে দ্রুত সমস্যার সমাধান করতে হবে, কারণ এই সংঘাতের মূল ভুক্তভোগী হচ্ছে কোমলমতি শিশুরা।
বর্তমানে নোয়াখালীর প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শুরু করে শহরের বিদ্যালয়গুলোতেও একই দৃশ্য—স্কুলের মাঠে শিক্ষকদের অবস্থান, শিক্ষার্থীদের হতাশা, আর অভিভাবকদের দুশ্চিন্তা। শিক্ষার পরিবেশ পুরোপুরি স্থবির হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে যেসব বিদ্যালয়ে প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার প্রস্তুতি চলছিল, সেখানে এই কর্মবিরতির প্রভাব ভয়াবহ। শিক্ষার্থীদের অনেকেই পরীক্ষার আগে মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। শিক্ষা বিশ্লেষকরা বলছেন, এই ধরনের অচলাবস্থা যত দীর্ঘস্থায়ী হবে, ততই তা শিক্ষার মান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তারা মনে করেন, সরকারকে দ্রুত সময়ের মধ্যে শিক্ষকদের দাবিগুলো বাস্তবায়ন করে তাদের কাজে ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় স্থিতিশীলতা ফিরে আসে।
নোয়াখালীর প্রায় ১২ শ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ থাকায় শিক্ষা অঙ্গনে যে সংকট তৈরি হয়েছে, তা শুধু একটি জেলার নয়, বরং পুরো জাতির জন্য উদ্বেগজনক একটি চিত্র। শিক্ষকরা তাদের ন্যায্য দাবির জন্য আন্দোলনে নেমেছেন, কিন্তু এই আন্দোলনের প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ ক্ষতির মুখে পড়ছে। তাই এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সরকারের কার্যকর ভূমিকা ও সংলাপের মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করা, যাতে শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবক—সবাই তাদের স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে পারেন এবং প্রাথমিক শিক্ষার এই অচলাবস্থা দ্রুতই দূর হয়।



