চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে একটি জাহাজভাঙা কারখানায় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত ১৪ আগস্ট ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডে পুরোনো একটি জাহাজ কাটার সময় ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার পর কয়েকজন শ্রমিক অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও কয়েকজনের মৃত্যু হলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় নয়জনে।
দুর্ঘটনার পর জাহাজের ভেতরে হাইড্রোজেন সালফাইড (H₂S) গ্যাসের উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়। বিস্ফোরক পরিদপ্তরের পরীক্ষায় দুর্ঘটনার কয়েক ঘণ্টা পরও জাহাজের ভেতরে গ্যাসটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। বিষাক্ত এই গ্যাস বদ্ধ জায়গায় মানুষের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ফলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে কীভাবে জাহাজের ভেতরে কাজ শুরু করা হয়েছিল, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, জাহাজের একটি বদ্ধ অংশে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাসের সংস্পর্শে এসেই শ্রমিকেরা অসুস্থ হয়ে পড়েন। একজন শ্রমিক অসুস্থ হওয়ার পর তাকে উদ্ধারে অন্য শ্রমিকেরা এগিয়ে গেলে তারাও গ্যাসের সংস্পর্শে আক্রান্ত হন বলে জানা গেছে। এ ঘটনায় উদ্ধার ও নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, দুর্ঘটনাকবলিত জাহাজটি কাজ শুরুর আগে নিরাপদ হিসেবে ছাড়পত্র পেয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাহলে ছাড়পত্র পাওয়ার পরও কীভাবে জাহাজের ভেতরে প্রাণঘাতী গ্যাসের উপস্থিতি তৈরি হলো—এখন সেটিই তদন্তের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন। কাজ শুরুর আগে গ্যাস পরীক্ষা, জাহাজের ভেতরের বায়ু চলাচল এবং শ্রমিকদের জন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
ঘটনার পর ইয়ার্ডটির কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ করা হয়েছে। দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে একাধিক তদন্ত কমিটি কাজ করছে। তদন্তে কারও গাফিলতি বা নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এদিকে নয় শ্রমিকের মৃত্যুতে তাদের পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। নিহতদের পরিবারকে আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও দেওয়া হয়েছে। তবে স্বজনদের দাবি, শুধু ক্ষতিপূরণ নয়, দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ প্রকাশ করে দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সীতাকুণ্ডের জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে এর আগেও নানা প্রশ্ন উঠেছে। নতুন এই দুর্ঘটনা সেই পুরোনো বিতর্ককে আবার সামনে এনেছে। বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে জাহাজ কাটার আগে বাধ্যতামূলক গ্যাস পরীক্ষা, নিয়মিত নিরাপত্তা তদারকি, শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং জরুরি উদ্ধারব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার দাবি জানানো হচ্ছে।
জাহাজভাঙা শিল্প বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও এর সঙ্গে যুক্ত শ্রমিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। নয় শ্রমিকের মৃত্যুর এই ঘটনা তাই শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়; বরং পুরো শিল্পের নিরাপত্তাব্যবস্থা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্নও সামনে নিয়ে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনেই এখন স্পষ্ট হবে—কোথায় ছিল গাফিলতি, আর কীভাবে ভবিষ্যতে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঠেকানো সম্ভব।



