তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক, তৃতীয় দিনেও চলছে মরিয়া উদ্ধার অভিযান; ক্ষতিগ্রস্ত ৯ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি
বোগোতা, ১৩ আগস্ট ২০২৬: ভয়াবহ ভূমিকম্পে কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দক্ষিণ আমেরিকার দেশ কলম্বিয়া। গত সোমবার (১০ আগস্ট) পশ্চিমাঞ্চলে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্পে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৬৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন প্রায় ৩ হাজার ৫০০ জন এবং এখনো প্রায় ৫০০ মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন বলে সর্বশেষ প্রতিবেদনে জানা গেছে। ধ্বংসস্তূপের নিচে আরও মানুষ আটকে থাকার আশঙ্কায় উদ্ধারকারীরা তৃতীয় দিনেও বিরামহীন অভিযান চালিয়ে যাচ্ছেন।
ভূমিকম্পের ভয়াবহতায় নিহতদের স্মরণে দেশটিতে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। শোক চলাকালে সরকারি ভবন এবং বিদেশে অবস্থিত কলম্বিয়ার দূতাবাসগুলোতে জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হচ্ছে। একই সঙ্গে উদ্ধার, চিকিৎসা ও পুনর্বাসন কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে সরকার।

এক শতাব্দীর ইতিহাসে ভয়াবহতম কম্পনগুলোর একটি
১০ আগস্ট সকালে আঘাত হানা ৭ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পটি কলম্বিয়ার সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় কয়েক সেকেন্ডের শক্তিশালী কম্পনে ভবন, সড়ক ও অন্যান্য অবকাঠামো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কালি ও পেরেইরার মতো বড় শহর থেকে শুরু করে আরও প্রত্যন্ত এলাকাতেও ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের খবর পাওয়া গেছে।
ভূমিকম্পের পর একের পর এক আফটারশক অনুভূত হওয়ায় উদ্ধারকাজ আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে প্রবেশের আগে নিরাপত্তা যাচাই করছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ দুর্বল হয়ে পড়া ভবন ও কাঠামো পরবর্তী কম্পনে আবারও ধসে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ধ্বংসস্তূপে জীবনের সন্ধান
দুর্যোগের তৃতীয় দিনেও উদ্ধারকারীদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য—ধ্বংসস্তূপের নিচে জীবিত কাউকে খুঁজে বের করা। কালি, পেরেইরা এবং অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি, ক্রেন, প্রশিক্ষিত অনুসন্ধানী কুকুর এবং বিশেষায়িত উদ্ধার সরঞ্জাম ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে উদ্ধারকারীরা যন্ত্রের শব্দ বন্ধ করে ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে কোনো মানুষের আওয়াজ বা নড়াচড়া শোনার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারাও উদ্ধার অভিযানে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিয়েছেন। অনেককে কোদাল-বেলচা দিয়ে ধ্বংসাবশেষ সরাতে দেখা গেছে। কোথাও কোথাও মানুষ হাত দিয়েই ইট, কংক্রিট ও ধাতব কাঠামো সরিয়ে আটকে পড়াদের সন্ধান করছেন। উদ্ধারকারীদের জন্য সময় এখন সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে থাকা মানুষের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা সময়ের সঙ্গে কমলেও পর্যাপ্ত পানি, বাতাস ও অনুকূল পরিস্থিতি থাকলে কেউ কেউ দীর্ঘ সময় টিকে থাকতে পারেন।
কালি ও পেরেইরায় ভয়াবহ ধ্বংসযজ্ঞ
ভূমিকম্পে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর মধ্যে কালি ও পেরেইরা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ভবন ধসে পড়ে রাস্তা ও আশপাশের এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কেবল ঘরবাড়িই নয়, হাসপাতাল, স্কুল, সড়ক ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পে ৯ হাজার ৫৫০টির বেশি ঘরবাড়ি ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পশ্চিমাঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতিও উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রমকে জটিল করে তুলছে।
হাসপাতালেও সংকট, বাইরে চলছে চিকিৎসা
ভূমিকম্পের আঘাতে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপরও ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতালগুলোর কিছু অংশ নিরাপত্তার কারণে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে চিকিৎসকদের রোগীদের খোলা জায়গা ও পার্কিং এলাকায় সরিয়ে নিতে হয়েছে। গুরুতর আহতদের চিকিৎসার পাশাপাশি বিপুলসংখ্যক মানুষের জন্য জরুরি চিকিৎসা, রক্ত ও ওষুধের ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
আহত মানুষের সংখ্যা দ্রুত বাড়ায় বিভিন্ন এলাকায় রক্তের চাহিদাও বেড়েছে। সাধারণ মানুষ রক্ত দিতে চিকিৎসাকেন্দ্র ও রক্তদান কর্মসূচিতে ভিড় করছেন। উদ্ধারকর্মীদের পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, স্বেচ্ছাসেবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা সম্মিলিতভাবে জরুরি সেবায় কাজ করছেন।
নিখোঁজদের খোঁজে পরিবারের অপেক্ষা
ভূমিকম্পের পর নিখোঁজ মানুষের সংখ্যা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন হিসাব পাওয়া গেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কয়েক হাজার মানুষের নিখোঁজ থাকার খবর এলেও যাচাই-বাছাইয়ের পর সর্বশেষ হিসাবে প্রায় ৫০০ মানুষ এখনো নিখোঁজ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে উদ্ধার অভিযান শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
ধ্বংসস্তূপের পাশে স্বজনদের অপেক্ষা এখন কলম্বিয়ার দুর্যোগের সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যগুলোর একটি। কেউ প্রিয়জনের জীবিত ফিরে আসার আশায় উদ্ধারকারী দলের দিকে তাকিয়ে আছেন, আবার কেউ নিখোঁজ স্বজনের কোনো খবর পাওয়ার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা অবস্থান করছেন।
জরুরি সহায়তা ও পুনর্গঠনের প্রস্তুতি
ভূমিকম্পের পর সরকার জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় উদ্ধার ও ত্রাণ তৎপরতা জোরদার করেছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য আশ্রয়, খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর, হাসপাতাল, স্কুল ও অবকাঠামো পুনর্নির্মাণের পরিকল্পনাও শুরু হয়েছে।
প্রেসিডেন্ট আবেলার্দো দে লা এসপ্রিয়েয়া জরুরি পুনর্গঠন তহবিল গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এই তহবিলের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্ত ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, স্কুল এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্নির্মাণে অর্থায়নের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক সহায়তাও ইতোমধ্যে কলম্বিয়ায় পৌঁছাতে শুরু করেছে।
আন্তর্জাতিক সহায়তাও বাড়ছে
ভূমিকম্পের ভয়াবহতায় কলম্বিয়ার প্রতি সংহতি জানিয়েছে বিভিন্ন দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন। উদ্ধার ও মানবিক সহায়তায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বাড়ছে। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনও ক্ষতিগ্রস্তদের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছে।
তবে দুর্গত এলাকায় অতিরিক্ত মানুষের ভিড় যাতে উদ্ধারকাজে বাধা না দেয়, সে বিষয়েও কর্তৃপক্ষ সতর্ক রয়েছে। ভারী উদ্ধারযন্ত্র চলাচল এবং ধ্বংসস্তূপে নিরাপদে প্রবেশের জন্য কিছু এলাকায় স্বেচ্ছাসেবকদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে লুটপাট ঠেকাতে কয়েকটি এলাকায় কারফিউ বা অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
সামনে সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ পুনর্গঠন
উদ্ধার অভিযান এখনো শেষ হয়নি। নিখোঁজদের সন্ধান, আহতদের চিকিৎসা, গৃহহীন মানুষের আশ্রয় এবং জরুরি খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা—সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে কলম্বিয়া সরকারকে। একই সঙ্গে আফটারশকের ঝুঁকি এবং ক্ষতিগ্রস্ত ভবনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়েও সতর্ক থাকতে হচ্ছে।
তবে উদ্ধারপর্ব শেষ হওয়ার পর শুরু হবে আরও দীর্ঘ ও কঠিন অধ্যায়—পুনর্গঠন। হাজার হাজার পরিবারকে নতুন করে ঘরবাড়ি তৈরি করে দিতে হবে, ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণ করতে হবে এবং যোগাযোগব্যবস্থা সচল করতে হবে। ভয়াবহ এই ভূমিকম্প তাই শুধু তাৎক্ষণিক প্রাণহানির সংকট নয়; কলম্বিয়ার জন্য এটি দীর্ঘমেয়াদি মানবিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনেরও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি: ১৩ আগস্টের সর্বশেষ প্রতিবেদনে মৃতের সংখ্যা ২৬৫, আহত প্রায় ৩,৪৯৪ জন এবং নিখোঁজ ৪৯৬ জন বলে জানানো হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির হিসাব আরও পরিবর্তিত হতে পারে।



