বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচকে অনেক সময়ই আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হয়। তবে মায়ামির স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের লড়াই সেই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। বিশ্বকাপ ইতিহাসের অন্যতম রোমাঞ্চকর এই ম্যাচে দুই দল মিলে করেছে ১০টি গোল। নাটকীয় ওঠানামায় ভরা ম্যাচে শেষ পর্যন্ত ৬-৪ ব্যবধানে জয় তুলে নিয়ে তৃতীয় স্থান নিশ্চিত করেছে ইংল্যান্ড। একই সঙ্গে ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর ছেলেদের বিশ্বকাপে এটিই ইংলিশদের সেরা অর্জন এবং বিদেশের মাটিতে তাদের ইতিহাসের সর্বোচ্চ বিশ্বকাপ সাফল্য।
মায়ামির স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৬৪ হাজার ৪৭৮ দর্শক শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উপভোগ করেছেন আক্রমণাত্মক ফুটবলের এক দুর্দান্ত প্রদর্শনী। দুই দলের তারকা ফুটবলারদের অসাধারণ নৈপুণ্য, দ্রুতগতির আক্রমণ এবং একের পর এক গোল ম্যাচটিকে বিশ্বকাপের সবচেয়ে স্মরণীয় তৃতীয় স্থান নির্ধারণী লড়াইগুলোর কাতারে নিয়ে গেছে।
ম্যাচের শুরু থেকেই আধিপত্য বিস্তার করে ইংল্যান্ড। মাত্র তৃতীয় মিনিটে বুকায়ো সাকার নিখুঁত কর্নার থেকে ডেক্লান রাইস হেডে গোল করে দলকে এগিয়ে দেন। গোল হজমের ধাক্কা সামলে ওঠার আগেই ১৮ মিনিটে ব্যবধান দ্বিগুণ করে ইংল্যান্ড। রাইসের বাড়ানো বল থেকে ডিফেন্ডার এজেরি কনসা ঠান্ডা মাথায় জালে বল পাঠিয়ে স্কোরলাইন করেন ২-০।

ফ্রান্স তখনও ম্যাচে ফেরার চেষ্টা করছিল, কিন্তু ইংল্যান্ডের দ্রুতগতির আক্রমণের সামনে তারা ছিল অসহায়। ৩৭ মিনিটে মার্কাস রাশফোর্ডের চমৎকার পাস থেকে নিজের প্রথম গোল করেন বুকায়ো সাকা। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে এবেরেচি এজেরের অ্যাসিস্ট থেকে দ্বিতীয় গোল করে বিরতির আগেই ইংল্যান্ডকে ৪-০ ব্যবধানে এগিয়ে দেন তিনি। ১৯৩০ সালের পর বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রথমার্ধেই চার গোলের ব্যবধানে পিছিয়ে পড়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা হয় ফ্রান্সের।
বিরতির পর সম্পূর্ণ ভিন্ন চেহারায় মাঠে নামে ফরাসিরা। ৪৮ মিনিটে মাইকেল ওলিসের নিখুঁত পাস থেকে কিলিয়ান এমবাপে গোল করে ব্যবধান কমান। মাত্র ছয় মিনিট পর এমবাপের অসাধারণ পাস কাজে লাগিয়ে ব্র্যাডলি বারকোলা গোল করলে ম্যাচে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হয়। এরপর ৬৬ মিনিটে আবারও ওলিসের অ্যাসিস্ট থেকে নিজের দ্বিতীয় গোল করেন এমবাপে। একসময় ৪-০ ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা ফ্রান্স মুহূর্তেই স্কোরলাইন ৪-৩ করে ম্যাচে নাটকীয় প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দেয়।
এমবাপের জোড়া গোল শুধু ম্যাচেই নয়, বিশ্বকাপ ইতিহাসেও নতুন অধ্যায় লিখেছে। এই দুই গোলের মাধ্যমে বিশ্বকাপে তার মোট গোলসংখ্যা দাঁড়ায় ২২, যা তাকে বিশ্বকাপের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতার আসনে বসিয়েছে। তিনি পেছনে ফেলেছেন লিওনেল মেসির ২১ গোলের রেকর্ড। একই সঙ্গে চলতি বিশ্বকাপে গোল্ডেন বুট জয়ের লড়াইয়েও সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন ফরাসি এই অধিনায়ক।
তবে ফ্রান্সের দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তনের স্বপ্ন ভেঙে দেন বুকায়ো সাকা। ম্যাচের ৮৭ মিনিটে পেনাল্টি থেকে গোল করে নিজের হ্যাটট্রিক পূর্ণ করেন ইংল্যান্ডের এই উইঙ্গার। বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে ১৯৬৬ সালের ফাইনালে জিওফ হার্স্টের পর দ্বিতীয় ইংলিশ ফুটবলার হিসেবে হ্যাটট্রিক করার গৌরব অর্জন করেন তিনি। পাশাপাশি ১৯৫৮ সালের পর ফ্রান্সের বিপক্ষে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করা প্রথম ফুটবলার হিসেবেও নাম লেখান সাকা।
নির্ধারিত সময়ের যোগ করা ষষ্ঠ মিনিটে দায়ত উপামেকানোর পাস থেকে উসমান দেম্বেলে ফ্রান্সের হয়ে চতুর্থ গোল করেন। তখনও শেষ বাঁশি বাজতে বাকি ছিল কয়েক মুহূর্ত। কিন্তু নাটকীয়তার শেষ অধ্যায়টি লেখেন জুড বেলিংহ্যাম। ৯৮ মিনিটে দুর্দান্ত এক আক্রমণ থেকে গোল করে ইংল্যান্ডের ৬-৪ ব্যবধানের জয় নিশ্চিত করেন তিনি। এই গোলের মাধ্যমে চলতি বিশ্বকাপে বেলিংহ্যামের গোলসংখ্যা দাঁড়ায় সাত, যা একক বিশ্বকাপে কোনো ইংলিশ ফুটবলারের সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড।
ম্যাচটি ব্যক্তিগত কীর্তির দিক থেকেও ছিল ব্যতিক্রমী। ফ্রান্সের মিডফিল্ডার মাইকেল ওলিসে তিনটি অ্যাসিস্ট করে টুর্নামেন্টে নিজের মোট অ্যাসিস্ট সংখ্যা সাতে উন্নীত করেন। এর মাধ্যমে তিনি এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের নতুন রেকর্ড গড়েন। এর আগে ১৯৭০ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের কিংবদন্তি পেলের করা ছয়টি অ্যাসিস্ট ছিল দীর্ঘদিনের রেকর্ড।
অন্যদিকে, ফ্রান্সের জন্য দিনটি ছিল হতাশায় ভরা। বিশ্বকাপের ইতিহাসে এই প্রথম তারা এক ম্যাচে ছয় গোল হজম করল। শুধু তাই নয়, যেকোনো প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচে ৬৬ বছর পর আবারও ছয় গোল খাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলো দিদিয়ের দেশমের দল। রক্ষণভাগের দুর্বলতা, সুযোগ নষ্ট এবং ম্যাচের শুরুতে ছন্দ হারিয়ে ফেলা শেষ পর্যন্ত তাদের বড় পরাজয়ের অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের ইতিহাসেও নতুন রেকর্ড গড়েছে এই লড়াই। এর আগে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছিল ১৯৫৮ সালের ম্যাচে, যেখানে ফ্রান্স পশ্চিম জার্মানিকে ৬-৩ ব্যবধানে হারিয়েছিল এবং মোট গোল হয়েছিল ৯টি। ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের এই ম্যাচে হয়েছে ১০ গোল, যা এখন বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচের সর্বোচ্চ গোলের নতুন রেকর্ড হিসেবে ইতিহাসে জায়গা করে নিল।
সব মিলিয়ে, এটি শুধু একটি তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচ ছিল না; বরং ছিল বিশ্বকাপের ইতিহাসে অন্যতম সেরা আক্রমণাত্মক লড়াই। বুকায়ো সাকার ঐতিহাসিক হ্যাটট্রিক, এমবাপের নতুন গোলরেকর্ড, বেলিংহ্যামের নতুন মাইলফলক এবং ইংল্যান্ডের দুর্দান্ত দলীয় পারফরম্যান্স—সবকিছু মিলিয়ে ফুটবলপ্রেমীদের জন্য এটি হয়ে থাকবে বহু বছর মনে রাখার মতো একটি ম্যাচ।



