Homeঅর্থনীতিকৌশলগত নতুন পথ: বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ভারত থেকে সরে আসছে ঢাকা

কৌশলগত নতুন পথ: বেইজিংয়ের ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে ভারত থেকে সরে আসছে ঢাকা

ঢাকা, ৫ আগস্ট:
দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক মানচিত্রে নীরবে এক বড় পরিবর্তনের আভাস দিচ্ছে বাংলাদেশ। ঐতিহ্যগতভাবে ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হলেও, সাম্প্রতিক সময়ের বেশ কয়েকটি কূটনৈতিক, বাণিজ্যিক ও প্রতিরক্ষা সম্পর্কের সূক্ষ্ম ইঙ্গিত বলছে—বাংলাদেশ এখন ধীরে ধীরে নয়াদিল্লির কক্ষপথ থেকে সরে এসে বেইজিংয়ের দিকে ঝুঁকছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ পরিবর্তন কেবল দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সামগ্রিক কৌশলগত ভারসাম্যকেও প্রভাবিত করতে পারে।

চীনের সঙ্গে সম্পর্ক আরও দৃঢ়, ভারতের সঙ্গে শীতলতা?

সম্প্রতি চীনের সঙ্গে একাধিক বড় প্রকল্পে অংশ নিচ্ছে বাংলাদেশ। পায়রা ও মাতারবাড়ি সমুদ্রবন্দর, রেল ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন, এমনকি প্রতিরক্ষা খাতে সরাসরি সহযোগিতাও দৃশ্যমান। অপরদিকে, বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক এখন অনেকটাই আনুষ্ঠানিক সৌজন্যতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে বলে মনে করছেন কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা।

পানি বণ্টন, সীমান্ত হত্যা, এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই জনমনে ক্ষোভ জমেছে। ঢাকার কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, ভারত হয়তো এতদিন ‘বন্ধুত্বের’ নামে তার প্রভাব কাজে লাগালেও, বাংলাদেশ এখন তার স্বার্থের কথা ভেবে বিকল্প খুঁজছে—এবং সেই বিকল্পের নাম চীন।

মধ্যপন্থা নাকি মেরুকরণ?

সরকারি পর্যায়ে যদিও বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ‘ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির’ কথা বলা হচ্ছে, তবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘অল-ব্যালান্সিং’ বা সবার সঙ্গে বন্ধুত্বের নীতিতে ফাটল ধরছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আনিসুজ্জামান বলেন,

“বাংলাদেশ এখন একটি ‘নতুন বাস্তবতায়’ প্রবেশ করছে। চীন তার বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI)-এর মাধ্যমে যে প্রভাব বিস্তার করছে, তাতে ঢাকা নিজেকে চীনের ঘনিষ্ঠ কৌশলগত সহযোগী হিসেবেই প্রস্তুত করছে বলে মনে হয়।”

ভারতের প্রতিক্রিয়া কী?

ভারতের পররাষ্ট্র দপ্তর এখনও পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেনি। তবে ভারতের একাধিক প্রভাবশালী মিডিয়া ও থিঙ্কট্যাংক ইতোমধ্যেই উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। তারা বলছে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবর্তন এবং চীনের অর্থনৈতিক অনুপ্রবেশ ভারতের জন্য একটি বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে।

বাংলাদেশের স্বার্থ কোথায়?

বলা বাহুল্য, আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই—আছে কেবল স্বার্থ। এবং বাংলাদেশ সম্ভবত এখন সেই স্বার্থকেই সর্বাগ্রে রাখছে। উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর, অবকাঠামো নির্মাণ, ও অর্থনৈতিক সহায়তা—এসব দিক দিয়ে চীন এখন অনেক বেশি সক্রিয়।

তবে এই ঝুঁকিরও দিক আছে। একদিকে যেমন চীনের ঋণে নির্ভরতা বাড়ছে, অন্যদিকে পশ্চিমা জোট ও কোয়াড-এর মতো ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জটিল হয়ে উঠতে পারে।


উপসংহার:
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দিল্লির সঙ্গে ঐতিহাসিক সম্পর্কের ভারে নতি স্বীকার না করে, বেইজিংয়ের আধুনিক অর্থনৈতিক কূটনীতির সাথে এগিয়ে যাওয়ার ইচ্ছাই এখন দৃশ্যমান। তবে এই কৌশলিক ভারসাম্য কতদিন ধরে রাখা সম্ভব হবে, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

spot_img