Homeআন্তর্জাতিকঅস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস, ডারউইনে ৯ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশের ইতিহাস, ডারউইনে ৯ উইকেটের অবিস্মরণীয় জয়

ডারউইন থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটে যোগ হলো নতুন এক গৌরবগাথা। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে ২৩ বছর পর টেস্ট খেলতে নেমেই ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশ। মারারা স্টেডিয়ামে স্বাগতিক অস্ট্রেলিয়াকে ৯ উইকেটে হারিয়ে চার দিনেই ম্যাচ শেষ করেছে নাজমুল হোসেন শান্তর দল। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় টেস্ট জয়, তবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটাই প্রথম।

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে প্রথম টেস্ট জয় এসেছিল ২০১৭ সালে মিরপুরে। আট বছর পর সেই জয়ের সঙ্গে যুক্ত হলো আরও বড় এক অর্জন। এবার প্রতিপক্ষকে তাদের নিজেদের মাটিতে হারিয়ে দিল বাংলাদেশ। শুধু জয় নয়, নয় উইকেটের বিশাল ব্যবধান এবং হাতে একদিনেরও বেশি সময় রেখে ম্যাচ শেষ করায় ডারউইনের এই সাফল্য বিশেষ তাৎপর্য বহন করছে।

ডারউইন টেস্টের নিয়ন্ত্রণ অবশ্য তৃতীয় দিন শেষ হওয়ার আগেই অনেকটাই নিয়ে নিয়েছিল বাংলাদেশ। ম্যাচের শুরুতেই দুর্দান্ত বোলিং করে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংস মাত্র ১৯৮ রানে গুটিয়ে দেয় সফরকারীরা। বাংলাদেশের হয়ে বল হাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখেন হাসান মাহমুদ। তাঁর দুর্দান্ত স্পেলে অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে এবং তিনি একাই তুলে নেন ছয়টি উইকেট।

প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়াকে অল্প রানে আটকে দেওয়ার পর ব্যাট হাতে ম্যাচের চিত্র পুরোপুরি বদলে দেয় বাংলাদেশ। সফরকারীদের ব্যাটসম্যানরা ধৈর্য, আক্রমণ ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যাটিংয়ের সমন্বয় করে বড় সংগ্রহ দাঁড় করান। তানজিদ হাসান তামিমের দুর্দান্ত শতক, নাজমুল হোসেন শান্তর ৮৪ রান এবং মেহেদী হাসান মিরাজের গুরুত্বপূর্ণ ৬৫ রানের ইনিংসে বাংলাদেশ সংগ্রহ করে ৪২৬ রান। এর ফলে প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশের লিড দাঁড়ায় ২২৮ রানে, যা অস্ট্রেলিয়ার জন্য ম্যাচে ফিরে আসার পথ কঠিন করে দেয়।

বাংলাদেশের বড় লিডের চাপ নিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামে অস্ট্রেলিয়া। শুরু থেকেই স্বাগতিক ব্যাটসম্যানদের ওপর ছিল তীব্র চাপ। একের পর এক উইকেট হারাতে থাকা অস্ট্রেলিয়ার সামনে তখন একমাত্র বড় প্রতিরোধ হয়ে দাঁড়ান ক্যামেরন গ্রিন। সতীর্থদের দ্রুত বিদায়ের পর ধৈর্য ও দৃঢ়তার সঙ্গে ব্যাট করে ক্যারিয়ারের তৃতীয় টেস্ট সেঞ্চুরি তুলে নেন তিনি। ৪টি চার ও ১টি ছক্কার সাহায্যে গ্রিন খেলেন ১০৪ রানের গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এটিই ছিল তাঁর প্রথম টেস্ট শতক।

গ্রিনের শতক অস্ট্রেলিয়াকে বড় বিপদ থেকে কিছুটা স্বস্তি দিলেও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ ফেরাতে পারেনি স্বাগতিকরা। বাংলাদেশের বোলাররা নিয়মিত চাপ ধরে রাখায় অস্ট্রেলিয়ার অন্য ব্যাটসম্যানরা কার্যকরভাবে গ্রিনকে সঙ্গ দিতে পারেননি। ফলে লড়াইটা কার্যত এক প্রান্তে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে। গ্রিনের ব্যাটে প্রতিরোধ তৈরি হলেও অন্য প্রান্তে উইকেট পড়তে থাকায় অস্ট্রেলিয়ার স্কোর খুব বেশি দূর এগোয়নি।

চতুর্থ দিনের সকালে অস্ট্রেলিয়ার লেজের ব্যাটসম্যানদের দ্রুত ফিরিয়ে দেওয়ার দায়িত্ব নেন মেহেদী হাসান মিরাজ। উইকেট থেকে পাওয়া টার্ন ও বাউন্সকে কাজে লাগিয়ে তিনি একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নেন। অ্যালেক্স ক্যারি, বিউ ওয়েবস্টার, প্যাট কামিন্স ও নাথান লায়নের মতো ব্যাটসম্যানদের আউট করে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংস দ্রুত গুটিয়ে দেন মিরাজ। শেষ পর্যন্ত নাথান লায়নকে ফিরিয়ে দ্বিতীয় ইনিংসে নিজের পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন তিনি।

দ্বিতীয় ইনিংসে ৬৬ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট নেওয়ার পাশাপাশি পুরো ম্যাচেই মিরাজ ছিলেন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান অস্ত্র। এই পাঁচ উইকেটের মাধ্যমে টেস্ট ক্যারিয়ারে তাঁর পাঁচ উইকেটের সংখ্যা দাঁড়ায় ১৫। ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে তাঁর নিয়ন্ত্রিত বোলিং এবং ধৈর্যশীল স্পেল বাংলাদেশের জয়ের ভিত আরও শক্ত করে।

অন্য প্রান্তে হাসান মাহমুদও নিজের ভূমিকা যথাযথভাবে পালন করেন। প্রথম ইনিংসে ছয় উইকেট নেওয়ার পর দ্বিতীয় ইনিংসেও গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ক্যামেরন গ্রিনের প্রতিরোধ ভেঙে দেন তিনি। দুই ইনিংস মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার নয়টি উইকেটের শিকার হন হাসান ও মিরাজ—যা বাংলাদেশের বোলিং আধিপত্যের স্পষ্ট প্রমাণ।

শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট হয় ২৮৪ রানে। বাংলাদেশের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় মাত্র ৫৭ রান। এত ছোট লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরুতেই অবশ্য কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে সফরকারীরা। ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই জশ হ্যাজলউডের বলে বোল্ড হয়ে প্রথম ইনিংসের সেঞ্চুরিয়ান তানজিদ হাসান তামিম শূন্য রানে ফেরেন। দলীয় চার রানেই প্রথম উইকেট হারায় বাংলাদেশ।

তবে তানজিদের বিদায়ের পর আর কোনো বিপদ হতে দেননি সাদমান ইসলাম ও মুমিনুল হক। দুই অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যান দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে ম্যাচ দ্রুত শেষ করে দেন। সাদমান ২৫ রানে অপরাজিত থাকেন। অন্যদিকে মুমিনুল অপরাজিত থাকেন ৩০ রানে। শেষ পর্যন্ত ওয়েবস্টারকে ডিপ ব্যাকওয়ার্ড পয়েন্ট দিয়ে বাউন্ডারি মেরে মুমিনুলই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক জয়ের রানটি তুলে নেন।

মুমিনুলের সেই বাউন্ডারির সঙ্গে সঙ্গেই মারারা স্টেডিয়ামে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ে বাংলাদেশি সমর্থকদের কণ্ঠ। গ্যালারি থেকে ভেসে আসে পরিচিত স্লোগান—“বাংলাদেশ, বাংলাদেশ!” অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশিদের উল্লাসে মুহূর্তেই যেন ডারউইনের স্টেডিয়াম রূপ নেয় এক টুকরো বাংলাদেশে। বাংলাদেশের ক্রিকেটাররাও জড়িয়ে ধরে উদযাপন করেন এই স্মরণীয় জয়।

ম্যাচের শেষ দিনে অস্ট্রেলিয়ান দর্শকদের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। আগের তিন দিনের তুলনায় গ্যালারি অনেকটাই ফাঁকা ছিল। স্টেডিয়ামের প্রিমিয়াম এক্সপেরিয়েন্স লাউঞ্জেও ছিল নীরবতা। আগের দিনগুলোর মতো সেখানে ছিল না জমজমাট আয়োজন, ছিল না ব্যস্ততার চিহ্ন। ম্যাচের ফল যে কার্যত নির্ধারিত হয়ে গেছে, সেই বাস্তবতা যেন মাঠের বাইরের পরিবেশেও স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল।

বাংলাদেশের এই জয়ে শুধু একটি টেস্ট ম্যাচের ফল বদলায়নি, বদলে গেছে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলাদেশ ক্রিকেটের ইতিহাসও। ২৩ বছর পর অস্ট্রেলিয়ায় টেস্ট খেলতে নেমে সরাসরি জয় তুলে নেওয়া, নয় উইকেটের বড় ব্যবধানে প্রতিপক্ষকে হারানো এবং ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা—সব মিলিয়ে এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের অন্যতম বড় সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো একটি অর্জন।

ক্যামেরন গ্রিনের ১০৪ রানের লড়াকু ইনিংস অস্ট্রেলিয়াকে ইনিংস ব্যবধানের পরাজয় থেকে রক্ষা করেছে, কিন্তু বাংলাদেশের জয়ের গল্পে তা শেষ পর্যন্ত একটি পার্শ্ব অধ্যায় হয়ে থাকল। তানজিদ-শান্ত-মিরাজের ব্যাটিং, হাসান মাহমুদের আগুনঝরা বোলিং এবং মিরাজের ঘূর্ণিতে গড়ে ওঠা এই জয় বাংলাদেশের দলীয় শক্তিরই প্রতিচ্ছবি।

ডারউইনের মারারা স্টেডিয়ামে লেখা হলো তাই বাংলাদেশের ক্রিকেটের নতুন ইতিহাস। অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে প্রথম টেস্ট জয়, নয় উইকেটের ব্যবধান এবং হাতে একদিনেরও বেশি সময় রেখে ম্যাচ শেষ—এই সবকিছু মিলিয়ে ডারউইনের জয় বাংলাদেশের ক্রিকেটের স্মরণীয় অধ্যায় হয়ে থাকবে। গ্রিনের শতক অস্ট্রেলিয়াকে লড়াইয়ে রেখেছিল, কিন্তু শেষ পর্যন্ত ডারউইনের ইতিহাসের নায়ক ছিল বাংলাদেশই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

Must Read

spot_img